মিয়ানমারের সেনাপ্রধান আলোচনার কেন্দ্রে

মিয়ানমারের নেত্রী ও স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ও তার ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে সোমবার ভোরে আকস্মিকভাবে গ্রেফতার করে দেশটির সেনাবাহিনী। মিয়ানমারের ক্ষমতা এখন সেনাবাহিনীর হাতে। তাই দেশটির শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং আলোচনার কেন্দ্রে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সম্পর্কে খুব কম তথ্যই জানা যায়। মিয়ানমারের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং নিয়ে বিশ্লেষণমূলক তথ্য তুলে ধরেছে রয়টার্স।

৬৪ বছর বয়সী মিন অং হ্লাং রাজনৈতিক অ্যাকটিভিজমের বিষয়ে স্পষ্টবাদী। ১৯৭২-৭৪ সালে তিনি যখন ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়েন তখন ছড়িয়ে পড়া অ্যাক্টিভিজমেও আগ্রহী ছিলেন না তিনি। ২০১৬ সালে তার এক সহপাঠী রয়টার্সকে বলেছিলেন, ‘তিনি খুব অল্প কথার মানুষ আর সাধারণত লো প্রোফাইলের।’

সহপাঠী শিক্ষার্থীরা যখন বিক্ষোভে যোগ দিতেন তখন মিন অং হ্লাং প্রতি বছরই মিলিটারি বিশ্ববিদ্যালয়, দ্য ডিফেন্স সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে (ডিএসএ) ভর্তির আবেদন করতেন। তৃতীয়বারের চেষ্টায় ১৯৭৪ সালে তিনি সফল হন।

ডিএসএ-তে তার ক্লাসের এক সদস্য ২০১৬ সালে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেন। ওই সদস্যের সঙ্গে মিন অং হ্লাংয়ের প্রতি বছর ক্লাস রিইউনিয়নে দেখাও হয়। ক্লাসমেট জানান, তিনি নিয়মিত এবং ধীরে ধীরে প্রমোশন পেতেন।’ তাকে অফিসারদের মাঝামাঝি র‍্যাংকে উঠে আসতে দেখার সময়ই ওই ক্লাসমেট অবাক হয়েছিলেন।

২০১১ সালে মিয়ানমারে গণতন্ত্র শুরুর সময় থেকে মিন সেনাবাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব নেন। ইয়াঙ্গুনের কূটনীতিকরা বলছেন, ২০১৬ সালে সু চি প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার সময় থেকে মিন পেছনের সারিতে থাকা সেনাসদস্য থেকে রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠেন।

পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এ সময় থেকে মিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের কর্মকাণ্ড প্রচার শুরু করেন। মিন বিভিন্ন পরিদর্শনে যান। গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করেন। তার প্রোফাইলের কয়েক হাজার ফলোয়ারও হয়। ২০১৭ সালে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর সেনাবাহিনীর হামলার আগপর্যন্ত এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মিন।

গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি ৮৩ শতাংশ আসনে জয়ী হয়। এই জয় মেনে নেয়নি সেনাবাহিনী। নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলেছে সেনাবাহিনী। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সেনাবাহিনী আবার ক্ষমতা দখল করবে—এমন গুঞ্জন চলছিল।

সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং কিছুদিন আগে এক বক্তব্যে মিয়ানমারের সংবিধান বাতিল করার হুশিয়ারি দেন। এরপরই উত্তেজনা চরমে ওঠে। গত সপ্তাহে ইয়াঙ্গুনের বাণিজ্যিক এলাকার রাস্তায়, রাজধানী নেপিডো ও অন্যান্য এলাকায় সেনাবাহিনীর ট্যাংক মোতায়েন করা হয়।

শেষ পর্যন্ত গুঞ্জনই সত্যি হয়েছে। স্থানীয় সময় সোমবার মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি, প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ত ও অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের আটক করে সেনাবাহিনী

এক বছরের জন্য দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সেনাবাহিনী। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পরিচালিত মিয়াওয়ারদি টিভিতে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের আইনব্যবস্থা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা মিন অং হ্লাইংয়ের কাছে হস্তান্তর করা হলো। এ ছাড়া দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সেনাবাহিনীর সাবেক জেনারেল মিন্ত সুয়ে

১৯৬২ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রায় ৫০ বছর ধরে সেনাবাহিনী সরাসরি শাসন করেছে। মিয়ানমারের ২০০৮ সালের সংবিধানের প্রণেতা হিসেবে, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেনাবাহিনী নিজেদের একটি স্থায়ী ভূমিকা নিশ্চিত করে রেখেছে। পার্লামেন্টের আসনে তারা অনির্বাচিত ২৫ শতাংশ কোটা এবং এর প্রধান প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র এবং সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা রেখে দেয়, তাতে নিশ্চিত হয় রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা।

About স্টাফ রিপোর্টার

Check Also

সংবাদ সম্মেলনে এসে শান্তির বার্তা দিল তালেবান

বিশ্বকে চমকে দিয়ে অতি দ্রুত কাবুল দখল করে ফেলার দুদিন পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে সংবাদ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *