মুখ-মুখোশের দ্বন্দ্বে জিতে যাক মুখ

এমন কোনো রাত কি আছে যা ভোর হয় না? বাস্তব অর্থে হয় নিশ্চয়ই। কিন্তু মেটাফোর হিসেবে রাতকে যদি ক্রান্তিকাল, সঙ্কট বা দুঃসময় হিসেবে ভাবি তাহলে মাঝে মাঝে মনে হয় সেই রাত বোধহয় কিছুতেই ভোর হবে না বা হচ্ছে না বা প্রলম্বিত হচ্ছে। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বলি না হয়। যে সমাজে আমরা আছি তাকে ‘রাত্রির’ মেটাফোর হিসেবে ভাবতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই ভাবনা ঠিক নয় মোটেই। রাত বা অন্ধকার বা কালো এসব কিছু নেতিবাচক নয়। দিনের আলোই খালি দরকার? রাতের অন্ধকারের দরকার নেই? অবশ্যই দরকার এবং দুইয়েরই প্রয়োজন সমান।

কিন্তু কালোকে আমরা নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করি। বলি, ‘দুর্নীতির কালো হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে’ অথবা ‘নির্বাচনে কালো টাকার দৌরাত্ম্য বাড়ছে’ অথবা ‘সন্ত্রাসের কালো থাবা থেকে ছাত্র রাজনীতি মুক্ত করতে হবে।’ সম্ভবত আমাদের ঔপনিবেশিক মন কালোর প্রতি বিরূপ। কালোর প্রতি বিদ্বেষী। মনে হয় কালোর প্রতি বৈরিতা বেশ শক্ত অবস্থানে আছে অবচেতনে। যা হোক বর্ণবাদ নয়, বলতে চেয়েছি সামাজিক সংকটের কথা।
মাঝে মাঝে মনে হয়  আমরা এক ম্যাজিক রিয়েলিজমের নগরে বাস করছি। এই সেই নগর যেখানে প্রায় শতভাগ আগুনে পোড়া নারী সন্তানদের বাঁচানোর জন্য হাহাকার করে কিন্তু কেউ এগিয়ে আসে না। যে বৃক্ষের হওয়ার কথা ছিল প্রাণদায়ী, নগরের ‘অসামান্য’ গুণে সেই বৃক্ষ হয়ে ওঠে প্রাণ হন্তারক। না, ভুল হলো। বৃক্ষকে প্রাণ হন্তারক বলা ভুল হলো। বৃক্ষ সব সময় প্রাণদায়ী। আসল হন্তারক মানুষ। সেই হন্তারক মানুষ যারা এই শহরে বৃক্ষ এবং মানুষকে বেড়ে ওঠার জন্য দরকারি জায়গাটুকু দেয় না। না বৃক্ষ না মানুষ, কারোর এখানে দরকারি জায়গাটুকু নিয়ে বাঁচার সুযোগ নেই। এই শহরে বৃক্ষ শেকড় গাড়ার সুযোগ পায় না। মানুষেরও শেকড় নেই এই শহরে। প্রত্যেক দিন এই নগরে কোনো না কোনো নির্মাণ কাজের ব্যবস্থাপনাগত গাফিলতির কারণে কেউ না কেউ মারা যায়। গাফিলতির কারণে যারা মারা যায় এদের প্রায় শতভাগ শ্রমিক শ্রেণীর বলে আমরা গা করি না। খালিদ মাহমুদ মিঠু সৃষ্টিশীল গুণী নির্মাতা, তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কিছুটা  হৈচৈ তৈরি হয়েছে। যদিও এই হৈচৈ ক্ষণকালের। এরপর আরেকজন কেউ রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি বা কোনো প্রতিষ্ঠান সংস্কার বা অন্য কোনো গাছের শেকড় আলগা হয়ে গাছচাপা বা অন্য কিছু চাপা পড়ে মরলে আবার কিছুদিন হৈচৈ হবে। আবার কিছু টক শো। কতিপয় সম্পাদকীয়, কয়েকটি উপ-সম্পাদকীয়, নিবন্ধ, কিছু প্রতিশ্রুতি…।
এ হচ্ছে সেই নগর যেখানে প্রেম প্রত্যাখ্যাত যুবক এসিড ছুড়ে ‘প্রেমিকা’র মুখ ঝলসে দিতে পারে। জমি সংক্রান্ত বিরোধ অমীমাংসিত থাকার অজুহাতে শিশু হত্যা হতে পারে। এই সেই নগর যেখানে প্রতিদিন রাস্তাঘাট, নালা নর্দমা, খাল-বিল, লেক-জলাশয় এমনকি বেডরুমে পর্যন্ত মানুষের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায় এবং হতে পারে কখনো সেই মৃতদেহের হন্তারক স্বয়ং আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ। একে আপনি নষ্ট শহর বলতে পারেন আবার ‘আদর’ করে জাদুর শহরও বলতে পারেন। সম্প্রতি এই ‘জাদুর’ শহরে ঘটে যাওয়া এক জাদুবাস্তব ঘটনা ঘটেছে। ফরিদপুর জেলার পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের দরিদ্র হাফিজুরের কথা আমরা পত্রিকা মারফত জেনেছি। স্মরণ না থাকলে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিই। সেই হাফিজুর যে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অধ্যয়ন অনুষদের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। আমরা জানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও আবাসনের কপাল সকলের হয় না। হাফিজুরের হয়েছিল। হলের খোলা বারান্দায় অন্য আরো অনেকের সঙ্গে একটুখানি জায়গা করে নিতে পেরেছিল।

কিন্তু সম্ভবত এত সৌভাগ্য হাফিজুরের কপাল নিতে পারছিল না। খোলা বারান্দার নির্দয় উত্তরে হাওয়ায় সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। ধার-দেনা করে বাবা-মা ঢাকায় চিকিৎসা করতে আনার সময় পথেই মারা যায় হাফিজুর। হাফিজুরের কাহিনী গণমাধ্যম এভাবেই জানিয়েছে আমাদের। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হাফিজুরের বাবা-মাকে অকালমৃত সন্তানের ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে চার লাখ টাকার অনুদান প্রদানের এক অনুষ্ঠান আয়োজন করে। সেখানে হাফিজুরের বাবা-মা ইসহাক মোল্লা ও হালিমা বেগম সেই দান গ্রহণ করে বলেছেন, তারা এই অনুদান নিলেন বটে, কিন্তু যেহেতু হাফিজুরই ছিল তাদের একমাত্র প্রকৃত সম্পদ, তাই তারা তাদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করতে চায়।

সন্তানহারা এই দম্পতি তাদের ইচ্ছা অনুযায় উইলও করে দিতে চেয়েছেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় একা দুদকই মামলা করেছে ৫৬টি। রাষ্ট্রের মালিকানাধীন ব্যাংকের হরিলুটের ঘটনায় যখন আমরা খাবি খাচ্ছি, তখন শুনতে পেলাম ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের এ্যাকাউন্ট হ্যাক করে লোপাট করে দেয়া হয়েছে ৮০০ কোটি টাকা। যে ৮০০ কোটি ডলার উধাও হয়েছে তা আমাদের অভিবাসী শ্রমিক ভাইদের বহু কষ্টের অর্থের একটি অংশ। ব্যাংক রিজার্ভ হ্যাকিংয়ের সঙ্গে যারা জড়িত নিশ্চিত করে বলা যায় তারা কেউ ইসহাক মোল্লা বা হালিমা বেগমের মতো দরিদ্র নন। দরিদ্র হালিমা বেগম ও ইসহাক মোল্লা নিজেদের যা আছে তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালকে দানের ঘোষণা দিয়ে সম্ভবত এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, অর্থের প্রয়োজন মানুষের আছে বটে তবে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নয়।

যারা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক হ্যাকিংয়ের সঙ্গে জড়িত তাদের কানে কি এই বার্তা পৌঁছবে? আমরা আলোকিত মানুষ বলতে যে তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ বুঝি ইসহাক মোল্লা বা হালিমা বেগম সেই অর্থে শিক্ষিত নন। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের ভাষা ধার করে বলতে হয় যে শিক্ষা দ্যুতি ছড়ায় না তা কোনো শিক্ষাই নয়। সেই অর্থে হ্যাকাররাই বরং অশিক্ষিত। একাডেমিক শিক্ষার ওজনদার সার্টিফিকেটের ভারে ভারাক্রান্ত যেসব ‘শিক্ষিত’রা দেশের মানুষের কষ্টার্জিত শ্রমের বিনিময়ে জমাকৃত অর্থ লোপাট করে দেন, ব্যাংক বীমা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেটে সাফা করে দেন, তারা কি কোনো দিন ইসহাক মোল্লা বা হালিমা বেগমের দেয়া বার্তা গ্রহণ করবেন? মনে হয় না। এর আগে বহুবার দেশের মামুলি কোনো রিকশাওয়ালা বা ভ্যানওয়ালা বা টোকাই বা ওই শ্রেণীর মানুষকে ব্যাগভর্তি টাকা নিয়ে থানায় জমা দিতে দেখেছি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিতান্ত অচেনা মানুষকে বাঁচাতে দেখেছি।

কিন্তু তথাকথিত ‘শিক্ষাওয়ালা’দের মধ্যে দেখি আত্মকেন্দ্রিকতা, ভোগলিপ্সা এবং স্বার্থপরতা। তাহলে বইয়ের ছাপানো অক্ষরগুলো মানুষকে কী শেখায়? ছাপানো অক্ষর যদি মানুষের মধ্যে ভুল শুদ্ধের বিচারবোধ তৈরি করতে না পারে, শিক্ষা যদি মানবিক বোধ এবং সভ্যতাকে দ্বিধার দিকে ঠেলে দেয়, নির্বিবাদে দেশের টাকা চুরি করতে প্রণোদিত করে, তবে কী লাভ সেই শিক্ষায়? শিক্ষার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দিকটি তো এই যে তা মানুষের সভ্যতার ওপর তার বিষদাঁতের কামড় বসাবে না।
বিভ্রান্ত সমাজ যেন প্রাযুক্তিক চুরি বিদ্যায় পারঙ্গম ডিজিটাল হ্যাকারদের দৃষ্টান্তকে অন্তত ঘৃণা করতে শেখে, ইসহাক মোল্লা এবং হালিমা বেগমের বার্তাটিই গ্রহণ করে এই আশাটুকু কি করতে পারি?

About স্টাফ রিপোর্টার

Check Also

তসলিমার ফেসবুক স্ট্যাটাসে গোপনাঙ্গের গোপন তথ্য !

আজ ৮ মার্চ। বিশ্ব নারী দিবস। নারীর সামাজিক অধিকার ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং স্বীকৃতি আদায়ের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *