যুক্তরাজ্যে লুকিয়ে রয়েছে যে তরুণ আফগানরা

আশ্রয়ের আশায় অভিভাবকহীন যেসব আফগান শিশু যুক্তরাজ্যে এসেছিল, কিন্তু আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, এমন শত শত আফগানকে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি দেশটির একটি আদালতের আদেশের পর এই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কিন্তু আফগানরা বলছে, আফগানিস্তানে ফেরত যাওয়া এখনো তাদের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আর তাই তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ভীতি আর উদ্বেগ।
এরকম একজন আফগান দক্ষিণ লন্ডনের ইসমত। প্রতিবার পুলিশের গাড়ির শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার ভয়, এই হয়তো পুলিশ তাকে ধরার জন্য এলে।
কুড়ি বছরের ইসমত যুক্তরাজ্যে একজন অবৈধ অভিবাসী, যে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তিনবছর ধরে লুকিয়ে রয়েছে। চৌদ্দ বছর বয়সে যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তান থেকে সে পালিয়ে একাই যুক্তরাজ্যে চলে আসে। তার আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়, কিন্তু আঠারো বছর পর্যন্ত থাকার যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি পায়। কিন্তু তাকে ধরে দেশে পাঠানোর আগেই সে লুকিয়ে পড়েছে।

ইসমত বলছিলেন , ”আমি কখনো আমার বন্ধুর সঙ্গে থাকি। আমি কোন কাজ করতে পারি না। নিজের একটি বাসা ভাড়া করতে গেলেও তারা ভিসা বা ইনস্যুরেন্স দেখতে চায়। তাই আমি নিজের জন্য একটা রুমও ভাড়া নিতে পারিনা। এখন আমি আসলে একজন গৃহহীন। সেখান গেলে যদি আমার জীবনের নিরাপত্তা থাকতো, তাহলে আমি আফগানিস্তান ফিরে যেতাম।”
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরই আফগানিস্তানে সবচেয়ে বেশি বেসামরিক মানুষ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এই কারণ দেখিয়ে কয়েকজন আফগান তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করলে, গত বছরের অগাস্ট থেকে এর উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। কিন্তু সম্প্রতি সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। সেই মামলায় কয়েকজন আফগানের আইনজীবী ছিলেন তৌফিক হোসেইন।

মি. হুসেইন বলছেন, ”এখন থেকে স্বরাষ্ট্র দপ্তর বিমান ভাড়া করে আফগানদের দেশ ফেরত পাঠাতে শুরু করতে পারবে। কিন্তু , আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে পুরনো তথ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে। কারণ এখনো প্রতি সপ্তাহেই সেখানে আত্মঘাতী হামলা ঘটছে। আইসিসের উপস্থিতি বাড়ছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।”
আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, ২০০৭ সাল থেকে এমন দুই হাজারের বেশি আশ্রয় প্রত্যাশীকে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এদের একজন একুশ বছর বয়সী হিকমত।
হিকমত বলছেন, ”দেখুন, যখন আমি যুক্তরাজ্যে এলাম, আমার জীবন ছিল চমৎকার। এর চার বছর পর, তারা বললো, হিকমত, তোমাকে এখন তোমার দেশে ফেরত যেতে হবে।

কিন্তু দেশে গিয়েও আবার পালিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে আসেন হিকমত। অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে এসে এখন লুকিয়ে রয়েছেন।
তিনি বলছিলেন, ”আফগানিস্তান থেকে প্রথমে পাকিস্তান, তারপরে ইরান, সেখান থেকে তুরস্ক গিয়েছি। তারপর সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রীস, গ্রীস থেকে ইটালি, তারপরে ফ্রান্স যাই। সেখানে একজনকে টাকা দিলে সে তার গাড়ির ভেতর লুকিয়ে আমাকে ইংল্যান্ড নিয়ে আসে। কিন্তু এখানে আমি কোন জীবন গড়ে তুলতে পারছি না। আফগানিস্তানেও আপনি কোন পাবেন না। সেখানে যদি তালেবানের সঙ্গে কাজ করেন, সৈনিকরা আপনাকে মেরে ফেলবে। সৈনিকদের সঙ্গে যদি কাজ করেন, তালেবান আপনাকে হত্যা করবে।”

 

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য একটি বিবৃতিতে বলছে, তারা তাদের নীতি নিয়ে সন্তুষ্ট। কারণ কেউ যদি প্রমাণ করতে পারে যে, তার সত্যিই আশ্রয় দরকার, সেই আশ্রয় তারা দিয়ে থাকেন। তবে তারা এটা জানায়নি, অভিবাসীদের ফেরত পাঠাতে পরবর্তী বিমানটি কবে কাবুলের পথে রওনা হবে।
তবে আইনজীবীরা আশা করছেন, তারা আফগানিস্তানের নিরাপত্তা হীনতার যে নতুন তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করছেন, সেগুলো আদালতে তুলে ধরা হবে, এরপর হয়তো আফগানদের দেশে ফেরত পাঠানোর এই প্রক্রিয়া বন্ধ হবে।

 

 

About স্টাফ রিপোর্টার

Check Also

সংবাদ সম্মেলনে এসে শান্তির বার্তা দিল তালেবান

বিশ্বকে চমকে দিয়ে অতি দ্রুত কাবুল দখল করে ফেলার দুদিন পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে সংবাদ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *